IPL 2026 RCB vs GT: বিরাট কোহলির ৪৪ বলে ৮১, ‘জিদ্দি’ মানসিকতার রহস্য ফাঁস

 

গুজরাট টাইটান্সের বিরুদ্ধে ৪৪ বলে ৮১ রান করেন বিরাট কোহলি

বেঙ্গালুরু: টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ব্যাকরণ এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় যে স্কোরগুলোকে পাহাড়প্রমাণ মনে হতো, আজ সেগুলো নিতান্তই সাধারণ। কিন্তু ক্রিকেটের এই পরিবর্তিত মানচিত্রের সঙ্গে নিজেকে যেভাবে নতুন করে খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন বিরাট কোহলি, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। আইপিএল ২০২৬-এ গুজরাট টাইটান্সের বিরুদ্ধে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর (আরসিবি) ২০৬ রান তাড়া করতে নেমে কোহলির ৪৪ বলে ৮১ রানের বিধ্বংসী ইনিংসটি যেন আধুনিক টি-টোয়েন্টি ব্যাটিংয়ের এক নিখুঁত মাস্টারক্লাস।

শুক্রবার রাতে এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে যখন কোহলি ব্যাট হাতে ঝড় তুলছিলেন, তখন গ্যালারিতে থাকা হাজার হাজার আরসিবি ভক্ত আনন্দে আত্মহারা। চলতি আইপিএল মৌসুমে নিজেদের ঘরের মাঠে এটিই ছিল আরসিবির শেষ লিগ ম্যাচ, আর সেই মঞ্চকেই নিজের রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের জন্য বেছে নিলেন 'কিং কোহলি'।

কিন্তু কীসের জোরে ক্যারিয়ারের এই পড়ন্ত বেলায় এসেও এতটা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছেন বিরাট? গুজরাট টাইটান্সের সহকারী কোচ বিজয় দাহিয়া মনে করেন, কোহলির এই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে তার এক বিশেষ ‘জিদ্দি’ মানসিকতা বা নাছোড়বান্দা স্বভাব, যা তাকে নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের চেয়েও এক কদম এগিয়ে রাখছে।

ক্রিকেটের নতুন যুগের সঙ্গে অবিশ্বাস্য মানিয়ে নেওয়া

ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার নিয়ম চালু হওয়ার পর থেকে আইপিএলের চিত্রটাই বদলে গেছে। এখন ২০০ রান কোনো নিরাপদ স্কোর নয়। ব্যাটারদের ওপর প্রথম বল থেকেই আক্রমণ করার চাপ থাকে। এই হাই-স্কোরিং যুগে অনেকেই যখন নিজেদের পুরোনো খোলস ছেড়ে বের হতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন বিরাট কোহলি নিজেকে আক্ষরিক অর্থেই রি-প্রোগ্রাম বা নতুন করে তৈরি করেছেন।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই কোহলির এই ‘২.০’ ভার্সনের প্রমাণ পাওয়া যায়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তার স্ট্রাইক রেট ছিল ১৩৫-এর আশেপাশে, যা একজন ক্ল্যাসিক্যাল অ্যাঙ্করের জন্য আদর্শ। কিন্তু খেলা যখন বদলাতে শুরু করল, কোহলিও নিজেকে বদলে ফেললেন।

২০২৪ সালের আইপিএলে তিনি ১৫৪.৬৯ স্ট্রাইক রেটে ৭৪১ রান করেছিলেন। এরপর ২০২৫ সালে আরসিবির ঐতিহাসিক আইপিএল শিরোপা জয়ের পেছনেও তার বড় অবদান ছিল, যেখানে তিনি ১৪৪.৭১ স্ট্রাইক রেটে ৬৫৭ রান করেন। আর এই ২০২৬ মৌসুমে কোহলি যেন আরও একটি নতুন গিয়ার খুঁজে পেয়েছেন। এখন পর্যন্ত মাত্র সাত ম্যাচ খেলে ১৬৩.১৮ স্ট্রাইক রেটে ৩২৮ রান করেছেন তিনি। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, পাওয়ারপ্লে-তে ধীরগতিতে শুরু করার যে অপবাদ তার গায়ে লেগেছিল, তা তিনি সম্পূর্ণ মুছে ফেলেছেন। এই বছর পাওয়ারপ্লে-তে তার স্ট্রাইক রেট ১৬৯.৪। তিনি এখন আর ম্যাচের গতির জন্য অপেক্ষা করেন না, বরং প্রথম বল থেকেই বোলারদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেন।

‘জিদ’-এর দর্শন: আয়নার সামনের মানুষটির সাথে লড়াই

যে মানুষটি বিশ্ব ক্রিকেটের প্রায় প্রতিটি চূড়ায় নিজের নাম খোদাই করেছেন, তাকে এখনও কোন জিনিসটি এত তাড়িয়ে বেড়ায়?

শুক্রবারের ম্যাচের পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে গুজরাট টাইটান্সের সহকারী কোচ বিজয় দাহিয়া এর চমৎকার একটি ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, "হিন্দিতে একটি শব্দ আছে—'জিদ্দি' বা একগুঁয়ে। অনেক সময়ই আমরা শব্দটিকে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করি। কিন্তু বিরাটের ক্ষেত্রে এই জিদটাই হলো ভালো কিছু করার জিদ। এটাই তাকে বাকিদের থেকে আলাদা করে।"

দাহিয়ার মতে, কোহলি এখন আর সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করার জন্য খেলেন না। তার লড়াইটা এখন একান্তই নিজের সাথে। দাহিয়া বলেন, "ও এত বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছে। এখন আর কাউকে নতুন করে কিছু প্রমাণ করার নেই ওর। ওর লড়াইটা আসলে আয়নার সামনের মানুষটার সাথে। ও প্রতিদিন গতকালের চেয়ে নিজেকে আরও উন্নত দেখতে চায়। ফিটনেস এবং শৃঙ্খলার দিক থেকে বিরাট এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ওর এই রুটিন মেনে চলা খুবই কঠিন, তবে আমরা সবাই ওর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি।"

বাইশ গজের রাজা এবং ফিটনেসের চরম নিদর্শন

চিন্নাস্বামীর পিচ শুক্রবার খুব একটা সহজ ছিল না। দাহিয়ার মতেই, উইকেট কিছুটা বিভ্রান্তিকর আচরণ করছিল। কিন্তু কোহলির ব্যাটিং দেখে তা বোঝার উপায় ছিল না। যদিও ইনিংসের শুরুতেই শূন্য রানে ওয়াশিংটন সুন্দর তার একটি ক্যাচ ফেলার মতো মারাত্মক ভুল করেছিলেন। আর সেই ভুলের চরম মাশুল গুনতে হয় গুজরাটকে। জীবন পেয়ে কোহলি কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারেন, তা তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন ৮টি চার এবং ৪টি বিশাল ছক্কার মাধ্যমে। ফাস্ট বোলারদের লেন্থ নষ্ট করতে তিনি বারবার ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এসে শট খেলেছেন।

তবে কোহলির এই ইনিংসের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য কেবল বাউন্ডারি হাঁকানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার শারীরিক সক্ষমতা এবং রানিং বিটুইন দ্য উইকেট ছিল চোখে পড়ার মতো। গত কয়েক বছর ধরে লন্ডনে অফ-সিজনে তিনি যে কঠোর কন্ডিশনিং ও ফিটনেস ট্রেনিং করেছেন, তার সুফল মাঠেই দেখা যাচ্ছে।

দাহিয়া অবাক হয়ে বলেন, "ওর মানসিকতাই ওকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে। ভালো করার প্রবল ইচ্ছা ওর ভেতরে এখনও তরতাজা। বাইশ গজে ও এখনও অন্যতম সেরা দৌড়বিদ। মাঠের ছোট বাউন্ডারির দিকে শট খেলেও ও যেভাবে তরুণ ক্রিকেটারদের দুই রান নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল, তা সত্যিই শিক্ষণীয়।"

পরিপূর্ণতার অদম্য তৃষ্ণা


ম্যাচজয়ী পারফরম্যান্স, ১৮৪.০৯ স্ট্রাইক রেট এবং প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচের পুরস্কার জেতার পরও কোহলির চোখেমুখে কোনো তৃপ্তির ছাপ ছিল না। বরং তার মনে হচ্ছিল, তিনি হয়তো মাঠে আরও কিছু রান ফেলে এসেছেন। এই চিরস্থায়ী অতৃপ্তিই সম্ভবত তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের মূল জ্বালানি।

ম্যাচ শেষের পর কোহলির সাথে হওয়া কথোপকথনের কথা উল্লেখ করে দাহিয়া বলেন, "ম্যাচের পর যখন ওর সাথে কথা বলছিলাম, দেখলাম ও কিছুটা হতাশ। ও আমাকে বলল যে, ওর এই ইনিংসটাকে সেঞ্চুরিতে রূপান্তর করা উচিত ছিল। ও এমনভাবে বলছিল যেন সেঞ্চুরি করাটা কতটা সহজ কাজ! পরিস্থিতি যখন আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে, তখন আপনি বোলারকে বাধ্য করেন আপনার পছন্দের জায়গায় বল করতে। বিরাট ঠিক এই ধরনের চাপটাই সৃষ্টি করেছিল গুজরাটের বোলারদের ওপর।"

আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে যেখানে পাওয়ার-হিটারদের জয়জয়কার, সেখানে বিরাট কোহলি প্রমাণ করেছেন যে সঠিক কৌশল, অদম্য জিদ এবং

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন