স্পোর্টস ডেস্ক: এত দিন তিনি রান বাঁচাচ্ছিলেন, চাপও তৈরি করছিলেন, কিন্তু উইকেট আসছিল না। তাই প্রশ্ন উঠছিল— জসপ্রীত বুমরাহ কি তাঁর স্বাভাবিক ছন্দে নেই? গতি কি কমে গেছে? ফিটনেস কি পুরোপুরি ঠিক আছে? আইপিএলের চলতি আসরে প্রথম পাঁচ ম্যাচে উইকেটশূন্য থাকার পর সেই সব আলোচনা আরও জোরদার হয়েছিল। কিন্তু বড় ক্রিকেটাররা অনেক সময় এক বলেই সমস্ত জবাব দিয়ে দেন। ঠিক সেটাই করলেন বুমরাহ। গুজরাত টাইটান্সের বিরুদ্ধে ম্যাচে ইনিংসের প্রথম বলেই সাই সুদর্শনকে ফিরিয়ে দিয়ে নিজের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটালেন মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের এই তারকা পেসার।
আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে সোমবার মুখোমুখি হয়েছিল গুজরাত টাইটান্স ও মুম্বই ইন্ডিয়ান্স। প্রথমে ব্যাট করে মুম্বই তোলে ৫ উইকেটে ১৯৯ রান। দলের ইনিংসের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিলক বর্মা, যিনি ৪৫ বলে অপরাজিত ১০১ রান করে আইপিএলে নিজের প্রথম শতরান পূর্ণ করেন। আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ২০০ রানের লক্ষ্য খুব অসম্ভব নয়। বিশেষ করে গুজরাতের মতো শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ থাকলে শুরুতেই প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা প্রয়োজন। সেই কাজের দায়িত্বই কাঁধে তুলে নেন বুমরাহ।
গুজরাতের ইনিংস শুরু হতেই প্রথম বল করতে আসেন তিনি। অফ স্টাম্পের বাইরে ফুল লেংথে রাখা বলটি মারতে যান সাই সুদর্শন। কভারের উপর দিয়ে খেলতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু ঠিকমতো টাইম করতে পারেননি। বল ব্যাটের একেবারে নীচের অংশে লেগে উঠে যায় কভারের দিকে। সেখানে থাকা কৃশ ভগত কোনও ভুল করেননি। ক্যাচটি নিরাপদে ধরে ফেলতেই স্বস্তির বিস্ফোরণ মুম্বই শিবিরে। আর সেই সঙ্গে শেষ হল বুমরাহর উইকেটহীনতার দীর্ঘ অধ্যায়।
এই একটি উইকেটের মূল্য শুধুই স্কোরবোর্ডে একটি নাম যোগ হওয়া নয়, মানসিক দিক থেকেও এর গুরুত্ব অনেক। কারণ, চলতি আইপিএলে প্রথম পাঁচ ম্যাচে একটিও উইকেট পাননি বুমরাহ। মোট ১৯ ওভার বল করে তাঁর ঝুলিতে ছিল শূন্য। বৈধ বলের হিসাবে ১১৪টি ডেলিভারি করার পরও কোনও ব্যাটারকে আউট করতে না পারা তাঁর মতো বোলারের জন্য বিরল ঘটনা। গুজরাতের বিরুদ্ধে প্রথম বলেই সেই আক্ষেপ দূর হয়। অর্থাৎ, এই মরসুমে ১১৫তম বৈধ বলেই আসে তাঁর প্রথম উইকেট। আর সব মিলিয়ে আইপিএলে তিনি ১৪৬ বল পর আবার উইকেটের দেখা পেলেন।
সংখ্যাগুলোই বলে দেয় বিষয়টি কতটা অস্বাভাবিক ছিল। কলকাতা নাইট রাইডার্সের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে ৪ ওভারে ৩৫ রান দিয়েও উইকেট পাননি তিনি। দ্বিতীয় ম্যাচে দিল্লি ক্যাপিটালসের বিরুদ্ধে ছিলেন তুলনামূলক মিতব্যয়ী— ৪ ওভারে ২১ রান, তবু সাফল্য অধরা। রাজস্থান রয়্যালসের বিরুদ্ধে ৩ ওভারে ৩২ রান দিয়ে উইকেটশূন্য থাকতে হয় তাঁকে। এরপর রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে ৪ ওভারে ৩৫ রান এবং পঞ্জাব কিংসের বিরুদ্ধে ৪ ওভারে ৪১ রান দেন। সব মিলিয়ে প্রথম পাঁচ ম্যাচে ১৯ ওভারে তাঁর খরচ ছিল ১৬৪ রান, কিন্তু উইকেট ছিল না একটিও।
এই পরিসংখ্যান থেকেই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল। অনেকেই বলছিলেন, বুমরাহ আগের মতো ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছেন না। কেউ কেউ তাঁর বলের গতি নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। আবার অনেকে মনে করেছিলেন, হয়তো তিনি পুরোপুরি ফিট নন। তবে ক্রিকেটে কখনও কখনও এমন সময় আসে, যখন বোলার ভাল বল করেও পুরস্কার পান না। ব্যাটার ভুল করলেও ক্যাচ পড়ে, এজ স্লিপে যায় না, কিংবা বল সোজা ফিল্ডারের হাতে না গিয়ে ফাঁক খুঁজে নেয়। বুমরাহর ক্ষেত্রেও প্রথম পাঁচ ম্যাচে অনেকটা তেমনই হয়েছে। তাই গুজরাত ম্যাচে প্রথম বলের সাফল্য তাঁর জন্য ছিল আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার মুহূর্ত।
শুধু প্রথম বলের উইকেট নিয়েই থেমে থাকেননি তিনি। পুরো স্পেল জুড়ে ছিলেন যথেষ্ট নিয়ন্ত্রিত। ৩ ওভারে মাত্র ১৫ রান খরচ করে ১ উইকেট নেন। এই সময়ের মধ্যে গুজরাতের ব্যাটারদের রান তোলার গতি চেপে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। শুরুর ধাক্কা যে কোনও রানতাড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর সেখানেই বুমরাহ মুম্বইকে এগিয়ে দেন।
তাঁর এই উইকেট ম্যাচের সুরও অনেকটাই বদলে দেয়। কারণ সাই সুদর্শন গুজরাতের টপ অর্ডারের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ব্যাটার। তাঁকে শূন্যতে ফিরিয়ে দেওয়ায় শুরুতেই চাপে পড়ে যায় গুজরাত। পরের ওভারে জস বাটলারও ফিরলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ়ভাবে চলে যায় মুম্বইয়ের হাতে। পরে মুম্বইয়ের বোলাররা, বিশেষ করে স্পিন বিভাগ, সেই চাপকে কাজে লাগিয়ে গুজরাতকে অলআউট করে মাত্র ১০০ রানে।
তাই বলা যায়, স্কোরকার্ডে বুমরাহর পরিসংখ্যান খুব বড় না দেখালেও তাঁর প্রথম বলের উইকেটই গুজরাতের রানতাড়ার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। যে বোলারকে ঘিরে গত কয়েক দিন নানা আলোচনা চলছিল, তিনিই আবার প্রমাণ করলেন কেন তাঁকে বিশ্বের সেরাদের একজন ধরা হয়। সব ম্যাচে চার-পাঁচ উইকেট নিতে হবে এমন নয়; অনেক সময় একটি বলই ম্যাচের মানসিক রূপরেখা বদলে দেয়।
মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের জন্য এই দৃশ্য অবশ্যই স্বস্তির। তিলক বর্মার শতরান যেমন দলের ব্যাটিংকে নতুন প্রাণ দিয়েছে, তেমনই বুমরাহর উইকেট পাওয়া বোলিং বিভাগকেও বাড়তি আত্মবিশ্বাস দেবে। সামনে কঠিন ম্যাচ আসবে, চাপও বাড়বে। সে সময়ে মুম্বই চাইবে, এই এক উইকেটই যেন বুমরাহর নতুন শুরুর ভিত্তি হয়ে ওঠে।
বড় বোলারদের নিয়ে সন্দেহ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সময় এলেই তাঁরা নিজেদের ভাষায় উত্তর দেন। আহমেদাবাদে সোমবার রাতে বুমরাহর প্রথম বলের উইকেট ছিল ঠিক তেমনই এক জবাব— সংক্ষিপ্ত, নিখুঁত এবং যথেষ্ট জোরালো।
