তিলক বর্মার বিস্ফোরক শতরান, স্পিনে গুজরাতকে গুঁড়িয়ে মুম্বইয়ের ৯৯ রানের দাপুটে জয়




 তিলক বর্মার বিস্ফোরক শতরান, স্পিনে গুজরাতকে গুঁড়িয়ে মুম্বইয়ের ৯৯ রানের দাপুটে জয়

আইপিএলের শুরুটা একেবারেই
মনমতো হয়নি মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের। টানা ব্যর্থতা, ব্যাটিংয়ে ছন্দের অভাব, বোলিংয়ে ধার কমে যাওয়া— সব মিলিয়ে চাপ বাড়ছিল দলটির উপর। তবে সময়মতো ঘুরে দাঁড়ানোর নামই তো বড় দল। রবিবার কলকাতার জয় যেমন আলোচনায় ছিল, ঠিক তার পরের দিন সোমবার নিজেদের দ্বিতীয় জয় তুলে নিয়ে আবারও প্রতিযোগিতায় জোরালো বার্তা দিল মুম্বই। আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে গুজরাত টাইটান্সকে ৯৯ রানে হারিয়ে একতরফা আধিপত্য দেখাল হার্দিক পাণ্ড্যের দল।


ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন তিলক বর্মা। দীর্ঘদিন রানখরায় ভোগার পর এদিন তাঁর ব্যাট থেকে বেরিয়ে আসে দুর্দান্ত এক শতরান। মাত্র ৪৫ বলে তিন অঙ্কে পৌঁছে তিনি শুধু নিজের আত্মবিশ্বাসই ফিরে পেলেন না, দলকেও বড় সংগ্রহের দিকে নিয়ে গেলেন। আর পরে যখন গুজরাত ব্যাট করতে নামে, তখন মন্থর উইকেটে মুম্বইয়ের স্পিনাররা কার্যত জাদু দেখান। ফলস্বরূপ ২০০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১০০ রানেই শেষ হয়ে যায় গুজরাতের ইনিংস।


টসে জিতে প্রথমে বল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল গুজরাত। শুরুতে সেই সিদ্ধান্ত খুব একটা ভুল বলেও মনে হয়নি। মুম্বইয়ের দুই ওপেনার দ্রুত ফিরে যান। নবাগত দানিশ মালেওয়া, যাঁর এদিন অভিষেক হল, মাত্র ৪ বলে ২ রান করে আউট হন। অন্যপ্রান্তে কুইন্টন ডি’ককও সুবিধা করতে পারেননি। ১১ বলে ১৩ রান করে তিনিও ফিরলে চতুর্থ ওভারের মধ্যেই ২ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে মুম্বই।


এরপর নমন ধীর ও সূর্যকুমার যাদব ইনিংস গড়ার চেষ্টা করেন। তবে সূর্যের ব্যাটে এদিনও বড় ইনিংস আসেনি। একটি চার ও একটি ছক্কা মেরে কিছুটা আশা জাগালেও ১০ বলে ১৫ রান করে তাঁকে ফিরে যেতে হয়। তখন মুম্বইয়ের রান তোলার গতি খুব একটা চোখে পড়ার মতো ছিল না। নমন ধীর ধৈর্য ধরে ইনিংস এগিয়ে নিতে থাকেন এবং তিলক বর্মার সঙ্গে জুটি বাঁধেন। নমন ৩২ বলে ৪৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন, যাতে ছিল ৬টি চার ও ১টি ছক্কা।


তবে এদিনের আসল গল্প তিলক বর্মাকে ঘিরেই। আগের পাঁচ ইনিংসে তিনি করেছিলেন মাত্র ৪৩ রান। স্বাভাবিকভাবেই সমালোচনা বাড়ছিল। এদিনও শুরুতে তাঁকে দেখে আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছিল না। শট নিতে পারছিলেন না, বল টাইম করতে অসুবিধা হচ্ছিল, এমনকি গ্যালারি থেকেও ব্যঙ্গধ্বনি ভেসে আসছিল। ১৪ ওভার শেষে মুম্বইয়ের রান ছিল ১০৩/৪। সেই সময় স্ট্র্যাটেজিক টাইমআউটেই যেন বদলে যায় সবকিছু। অধিনায়ক হার্দিক পাণ্ড্যকে দেখা যায় তিলকের সঙ্গে কথা বলতে। সেই কথাতেই যেন আগুন জ্বলে ওঠে মুম্বইয়ের তরুণ ব্যাটারের মধ্যে।


বিরতির পর একেবারে ভিন্ন মেজাজে ব্যাট করতে নামেন তিলক। গুজরাতের বোলারদের আর কোনও ছাড় দেননি তিনি। হার্দিককে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত রান তুলতে থাকেন। যদিও হার্দিক নিজে বড় ইনিংস খেলতে পারেননি, তবু নন-স্ট্রাইকার এন্ড থেকে তিলককে ক্রমাগত উজ্জীবিত করতে দেখা যায় তাঁকে। দু’জনের মধ্যে ৩৮ বলে ৮১ রানের জুটি মুম্বইকে ম্যাচে এগিয়ে দেয়। শেষ ৬ ওভারে মুম্বই তোলে ৯৬ রান— যা কার্যত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।


তিলকের ইনিংসের গতি ছিল অবিশ্বাস্য। প্রথম ২২ বলে তাঁর রান ছিল মাত্র ১৯। কিন্তু পরের ২৩ বলে তিনি করেন ৮২ রান। ১৮তম ওভারে অশোক শর্মার উপর ঝড় তোলেন তিনি— তিনটি ছক্কা ও দুটি চার আসে সেই ওভারে। প্রসিদ্ধ কৃষ্ণকেও ছাড়েননি। ১৫তম ওভারে তাঁর বিরুদ্ধে একটি ছক্কা ও দুটি চার মারার পর শেষ ওভারেও প্রসিদ্ধকে দু’টি চার ও দু’টি ছক্কা হাঁকান তিলক। শেষ পর্যন্ত ৪৫ বলে শতরান পূর্ণ করেন তিনি। মুম্বই ২০ ওভার শেষে দাঁড় করায় ১৯৯/৫। গুজরাতের হয়ে কাগিসো রাবাডা ৩৩ রান দিয়ে ৩ উইকেট নেন, আর মোহাম্মদ সিরাজ নেন ১টি উইকেট।


২০০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় গুজরাত। ইনিংসের প্রথম বলেই সাই সুদর্শনকে শূন্যরানে আউট করেন জসপ্রীত বুমরাহ। এরপর পরের ওভারে জস বাটলারকে ৫ রানে ফেরান হার্দিক পাণ্ড্য। শুরুতেই দুই নির্ভরযোগ্য ব্যাটারকে হারিয়ে গুজরাত কার্যত ম্যাচের বাইরে চলে যায়। কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন শুভমন গিল ও ওয়াশিংটন সুন্দর। বিশেষ করে ওয়াশিংটন নেমেই হার্দিককে দুটি চার মেরে চাপ কমানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই লড়াই বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।


শুভমন ১৪ রান করে আউট হওয়ার পর গুজরাতের ব্যাটিং আরও ভেঙে পড়ে। মাঝের ওভারে মুম্বইয়ের স্পিনাররা পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। অশ্বনী কুমার, যিনি এই মরসুমে এখনও খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেননি, এদিন হয়ে ওঠেন ম্যাচের অন্যতম নায়ক। তিনি শুভমন ছাড়াও রাহুল তেওয়াতিয়া, শাহরুখ খান এবং রশিদ খানকে ফিরিয়ে দেন। ৪ ওভারে ২৪ রান খরচ করে ৪ উইকেট নেন অশ্বনী।


তাঁকে দারুণ সঙ্গ দেন আল্লা গজনফর ও মিচেল স্যান্টনার। দু’জনেই ২টি করে উইকেট তুলে গুজরাতের ব্যাটিংকে গুঁড়িয়ে দেন। বুমরাহ ৩ ওভারে মাত্র ১৫ রান দিয়ে ১ উইকেট নেন, আর হার্দিকও শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ ব্রেকথ্রু এনে দেন। শেষ পর্যন্ত গুজরাত ১০০ রানেই অলআউট হয়ে যায়। মন্থর পিচে পরিকল্পিত বোলিং, চাপের মুহূর্তে সঠিক পরিবর্তন, আর তিলকের ব্যাটে বিস্ফোরক সমাপ্তি— এই তিন দিক মিলিয়েই একতরফা জয় তুলে নেয় মুম্বই।


এই জয়ের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হল তিলক বর্মার ফর্মে ফেরা। পাশাপাশি হার্দিক পাণ্ড্যের নেতৃত্বও আলাদা করে নজর কাড়ল। ব্যাট হাতে বড় অবদান না থাকলেও তিনি যেভাবে তিলককে মানসিকভাবে চাঙ্গা করেছেন এবং পরে বোলারদের ব্যবহার করেছেন, তা দলের জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘদিন পর মুম্বইকে আবার পুরনো মেজাজে দেখা গেল। আর গুজরাতের কাছে এই হার স্পষ্ট বার্তা— শুধু ভালো শুরু করলেই হবে না, ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে পরিকল্পনা ধরে রাখতে না পারলে আইপিএলে বাঁচা কঠিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন