![]() |
PCB punishes Dasun Shanaka |
আইপিএলের টাকার হাতছানি! চুক্তি ভেঙে পিসিবির কড়া শাস্তির মুখে দাসুন শনাকা ও মুজারাবানি
স্পোর্টস ডেস্ক: ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের দুনিয়ায় অর্থের ঝনঝনানি আর গ্ল্যামারের দিক থেকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) যে সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ক্রিকেটারের কাছেই আইপিএলে খেলার সুযোগ পাওয়া মানে হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো। কিন্তু এই আইপিএলের মোহেই এবার নিজেদের বিপদ ডেকে আনলেন শ্রীলঙ্কার দাসুন শনাকা এবং জিম্বাবোয়ের পেসার ব্লেসিং মুজারাবানি। আইপিএলে খেলার প্রস্তাব পেয়ে পাকিস্তান সুপার লিগের (পিএসএল) সঙ্গে করা চুক্তি মাঝপথে ভেঙে দেওয়ায় এই দুই তারকা ক্রিকেটারের উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা চাপাল পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)।
শনাকাকে এক বছরের জন্য এবং মুজারাবানিকে দুই বছরের জন্য পিএসএল থেকে নির্বাসিত করা হয়েছে। পিসিবির এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব ক্রিকেটে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, লিগ ছোট হোক বা বড়— চুক্তির বরখেলাপ কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।
শনাকার আকস্মিক দলবদল এবং এক বছরের নির্বাসন
২০২৬ সালের পিএসএল মরসুমের জন্য শ্রীলঙ্কার তারকা অলরাউন্ডার দাসুন শনাকাকে দলে নিয়েছিল লাহোর কালান্দার্স। নিলামের মাধ্যমে প্রায় ৭৫ লক্ষ পাকিস্তানি টাকার চুক্তিতে তাঁকে সই করিয়েছিল ফ্র্যাঞ্চাইজিটি। দলের পরিকল্পনাতেও তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার ঠিক কয়েক দিন আগে হঠাৎ করেই বেঁকে বসেন শনাকা। তিনি লাহোর ফ্র্যাঞ্চাইজিকে জানিয়ে দেন যে তিনি পিএসএলে খেলতে পারবেন না।
কারণটা কী? আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালস দলে ডাক পাওয়া! ইংরেজ অলরাউন্ডার স্যাম কারেন চোট পেয়ে ছিটকে যাওয়ায় তাঁর পরিবর্ত হিসেবে শনাকাকে বিশাল অঙ্কের প্রস্তাব দেয় রাজস্থান। সেই লোভনীয় প্রস্তাব ফেরাতে পারেননি এই লঙ্কান তারকা। কিন্তু তাঁর এই শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে লাহোর ম্যানেজমেন্টের।
পিসিবি এই ঘটনাকে চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবেই দেখেছে। বোর্ড মনে করে, একজন বিদেশি খেলোয়াড় যখন একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন, তখন তাঁকে ঘিরেই দলের রণনীতি সাজানো হয়। শেষ মুহূর্তে টাকার লোভে অন্য লিগে চলে যাওয়াটা টুর্নামেন্টের পেশাদারিত্বকে নষ্ট করে। আর সেই কারণেই শনাকাকে আগামী এক বছরের জন্য পিএসএল থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অবশ্য নিজের ভুল বুঝতে পেরে পিসিবির মাধ্যমে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন শনাকা। তিনি বলেন, "এইচবিএল পিএসএল থেকে নাম প্রত্যাহার করার যে সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছি, তার জন্য আমি গভীরভাবে অনুতপ্ত। পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ, পিএসএলের ভক্ত এবং বৃহত্তর ক্রিকেট সম্প্রদায়ের কাছে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইছি। পিএসএল একটি অত্যন্ত সম্মানজনক টুর্নামেন্ট, এবং আমার এই সিদ্ধান্তে যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে তা আমি বুঝতে পারছি। বিশেষ করে লাহোর কালান্দার্সের অনুগত সমর্থকদের আমি হতাশ করেছি, এর জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত।"
মুজারাবানির ক্ষেত্রে শাস্তি আরও কড়া
শনাকার মতো প্রায় একই কাজ করেছেন জিম্বাবোয়ের দীর্ঘকায় ফাস্ট বোলার ব্লেসিং মুজারাবানি। তবে তাঁর ক্ষেত্রে পিসিবি শাস্তির মাত্রা আরও বাড়িয়েছে। তাঁকে আগামী দুই বছরের জন্য পিএসএলে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মুজারাবানির ঘটনাটি আরও একটু নাটকীয়। গত ১১ ফেব্রুয়ারির পিএসএল নিলামে তিনি অবিক্রিত ছিলেন। কোনও দলই তাঁকে কেনেনি। পরবর্তীতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেসার শামার জোসেফ ছিটকে গেলে, তাঁর বদলি হিসেবে মুজারাবানির কাছে প্রস্তাব পাঠায় ইসলামাবাদ ইউনাইটেড। জিম্বাবোয়ের এই পেসার সেই প্রস্তাবে রাজিও হন। পারিশ্রমিক এবং চুক্তির অন্যান্য শর্তাবলীতে দুই পক্ষের মধ্যে পাকা কথাও হয়ে যায়।
কিন্তু ঠিক সেই সময়েই আইপিএল থেকে ডাক আসে তাঁর কাছে। কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) দলের তারকা পেসার মুস্তাফিজুর রহমানের বদলি হিসেবে তিনবারের আইপিএল চ্যাম্পিয়নরা মুজারাবানির সঙ্গে যোগাযোগ করে। কেকেআরের প্রস্তাব পেয়ে পিএসএলের কমিটমেন্ট বেমালুম ভুলে যান তিনি এবং সোজা আইপিএল খেলতে চলে যান।
পিসিবি এক কড়া বিবৃতিতে জানিয়েছে, মুজারাবানি লিগে অংশগ্রহণের মূল শর্তাবলীতে স্পষ্টভাবে সম্মত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর প্রতিশ্রুতিকে অসম্মান করেছেন। মৌখিক ও লিখিত সম্মতি দেওয়ার পর অন্য লিগে চলে যাওয়ার এই প্রবণতা রুখতেই তাঁকে দুই বছরের জন্য পিএসএলে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আইপিএল বনাম পিএসএল: পিসিবির এই কড়া অবস্থানের কারণ কী?
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, পিসিবির এই কড়া শাস্তির নেপথ্যে রয়েছে একটি বড় শঙ্কা। ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডারে আইপিএল এবং পিএসএলের সময়সূচি প্রায় একে অপরের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। যখন দুটি লিগ একই সময়ে চলে, তখন বিদেশি ক্রিকেটারদের প্রথম পছন্দ স্বাভাবিকভাবেই আইপিএল হয়, কারণ সেখানে পারিশ্রমিক পিএসএলের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি।
আর্থিক এবং সময়সূচির সুবিধার কারণে ক্রিকেটাররা আইপিএলকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। কিন্তু এর ফলে পিএসএলের দলগুলি চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকরা কোটি কোটি টাকা খরচ করে দল সাজাচ্ছেন, কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে আইপিএলের বদলি খেলোয়াড়ের ডাক পেলেই ক্রিকেটাররা বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে ভারতে চলে যাচ্ছেন।
এই প্রবণতা চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক স্পনসর এবং দর্শকদের কাছে পিএসএলের ব্রান্ড ভ্যালু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। টুর্নামেন্টের মর্যাদা ধরে রাখতে এবং ক্রিকেটারদের মধ্যে শৃঙ্খলার বার্তা দিতেই পিসিবি এবার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। বোর্ডের বার্তা পরিষ্কার— "যে লিগেই খেলুন না কেন, চুক্তি করলে তা সম্মান করতে হবে। অন্যথায় পাকিস্তানে খেলার দরজা চিরতরে বন্ধ হতে পারে।"
শনাকা এবং মুজারাবানির ঘটনা ভবিষ্যৎ বিদেশি ক্রিকেটারদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে থাকল। এখন দেখার বিষয়, পিসিবির এই কড়া পদক্ষেপের পর বিদেশি ক্রিকেটাররা ফ্র্যাঞ্চাইজি চুক্তির ক্ষেত্রে কতটা পেশাদারিত্ব দেখান।
